তিমির বনিক,মৌলভীবাজার সংবাদদাতা:
বাংলাদেশ রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, ইতিহাসের কালের সাক্ষী হয়ে আছেন দীর্ঘমেয়াদী অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী প্রয়াত এম সাইফুর রহমান। তাঁর রেখে যাওয়া রাজনৈতিক পরম্পরায়, ঈদের স্মৃতি এবং সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে সম্প্রতি এক বিশেষ আড্ডায় মুখোমুখি হয়েছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র, মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এম নাসের রহমান এবং তাঁর সহধর্মিণী। তাসনোভা-এর অনুষ্ঠানে উঠে এসেছে এই রাজনৈতিক পরিবারের অন্দরমহলের অনেক অজানা গল্প।
বাবার গৌরবময় অধ্যায় নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এম নাসের রহমান বলেন, "বাবার একটা ছায়া সবসময়ই আমাদের ওপর লেগে থাকে। অর্থমন্ত্রীর সন্তান হওয়ায় স্কুল, কলেজ কিংবা ইউনিভার্সিটিতে সবসময়ই একটা বাড়তি সম্মান ও ভালোবাসা পেয়েছি। তবে তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং অনন্য জীবনশৈলী শুধু আমাদের পরিবারকেই নয়, পুরো বাংলাদেশকে আলোড়িত করেছিল। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় অর্থমন্ত্রী হিসেবে মানুষের হৃদয়ে তিনি যে জায়গা করে নিয়েছেন, তা সত্যিই অতুলনীয়।"
১৯৯৫ সাল থেকে এলাকায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন এম নাসের রহমান। বাবার কোনো সরাসরি চাপ না থাকলেও স্থানীয় নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উৎসাহেই তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন। দল গঠন এবং বিগত নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে তিনি জানান, ২০০০ সালের নির্বাচনসহ পরবর্তী সময়ে প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। ওয়ান-ইলেভেনের কঠিন সময়ে যখন রাজনৈতিক মামলা ও হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল, তখনো শক্ত হাতে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। তবে মৌলভীবাজারের মানুষের ভালোবাসাই তাঁকে সবসময় মূল প্রেরণা জুগিয়েছে।
রাজনীতিবিদ স্বামীর পাশে থেকে কঠিন পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দিয়েছেন, সেই স্মৃতিকথায় নাসের রহমানের সহধর্মিণী বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় যখন চারদিকে এক থমথমে পরিস্থিতি, গভীর রাতে ঘন কুয়াশার মধ্যে একা গাড়ি ড্রাইভ করে ঢাকা থেকে কাশিমপুর কারাগারে স্বামীকে দেখতে ছুটে গেছেন তিনি। সন্তানদের দেখভাল করা এবং স্বামীর নির্বাচনী প্রচারণায় একা মাঠে নেমে নারীদের সংগঠিত করার সেই দিনগুলো ছিল ভীষণ চ্যালেঞ্জিং। তিনি বলেন,"মৌলভীবাজারের মানুষ আমাকে এতো ভালোবাসেন ও সম্মান করেন যে, কোনো প্রতিকূলতাই আমার কাছে কঠিন মনে হয়নি।"
পারিবারিক ঈদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নাসের রহমানের সহধর্মিণী জানান, বিয়ের পর দীর্ঘদিন হংকংয়ে থাকলেও পরবর্তীতে প্রতি বছরই ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে তাঁরা মৌলভীবাজারে ছুটে আসতেন। করোনা মহামারির সময় ছাড়া নাসের রহমান তাঁর রাজনৈতিক জীবনে কখনো ঢাকার মাটিতে কোরবানি করেননি, সবসময় গ্রামের মানুষের সাথেই ঈদ উদযাপন করেছেন।
তিনি আরও যোগ করেন, "আমার শাশুড়ির একটা দারুণ গুণ ছিল, তিনি সবাইকে নিয়ে মৌলভীবাজারে ঈদ করতে ভালোবাসতেন। উনার কাছ থেকে আমাদের সন্তানরাও গ্রামীণ সংস্কৃতির এই টান শিখেছে। আর ঈদের রান্নাবান্নার ক্ষেত্রে বিয়ের পর থেকে ইফতারিতে পেঁয়াজু, বেগুনি, বুট আমি নিজে না বানালে পুরো পরিবারের যেন চলতই না!" অন্যদিকে, প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান নিজে ও তাঁর স্ত্রী লাল গরু পছন্দ করতেন বলে প্রতি কোরবানির ঈদে গ্রামীণ হাট থেকে লাল গরু কেনাটা ছিল এই পরিবারের এক চেনা ঐতিহ্য।
পারিবারিক এই রাজনৈতিক ধারা কি আগামীতেও বজায় থাকবে? এমন প্রশ্নের জবাবে নাসের রহমানের সহধর্মিণী অত্যন্ত আশাবাদী কণ্ঠে তাঁর মেজো মেয়ের কথা উল্লেখ করেন। যিনি আমেরিকা থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে পরবর্তীতে লন্ডন বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ করেছেন। তিনি বলেন, "আমার মেজো মেয়ের মধ্যে ওর দাদার (এম সাইফুর রহমান) মতো দারুণ রাজনৈতিক গুণ রয়েছে। গত নির্বাচনে ও যেভাবে গ্রামে গ্রামে, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে সাধারণ মানুষকে অর্গানাইজ করে নির্বাচনী ক্যাম্পেইন করেছে, তা দেখে এলাকার সবাই মুগ্ধ। এলাকার মানুষ তো এখন আমার চেয়ে ওকেই বেশি খোঁজে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মে ওকেই রাজনীতিতে দেখার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।"
রাজনীতিতে সৌজন্যতাবোধ ও সোহার্দ্যের ওপর জোর দিয়ে এই দম্পতি জানান, মৌলভীবাজারের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কখনোই একে অপরের প্রতি চরম বৈরিতা বা মারামারি ছিল না; সব দলের মানুষ এখানে মিলেমিশে থাকে।
সাক্ষাৎকারের শেষে আগামী দিনের বাংলাদেশের প্রত্যাশা নিয়ে এম নাসের রহমান বলেন, "আমরা এমন এক বাংলাদেশ দেখতে চাই যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। রাজনীতি থেকে হানাহানি ও প্রতিহিংসা দূর হবে। একটি সুন্দর, স্থিতিশীল ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নই আমরা দেখি।" এম সাইফুর রহমানের দেখানো সততা ও জনকল্যাণের পথ ধরে তরুণ প্রজন্ম দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে—ঈদের এই বিশেষ আয়োজনে এমনটাই আশাবাদ ব্যক্ত করেন এই রাজনৈতিক দম্পতি।
প্রিন্ট করুন
ফটো কার্ড
এ জাতীয় আরো খবর..